বুধবার ২৮ অক্টোবার ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
বিশেষ প্রতিবেদন

রাজস্ব ফাঁকি থেকে ঘুষ-দুর্নীতি: ডিএসসিসিতে প্রশাসকের ‘জিরো টলারেন্স’ কতটা কার্যকর?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা নিউজ অনলাইন ২৪ ডেস্ক ০৭ সেপ্টেম্বার ২০২৬ ১২:৩৩ এ.এম

ছবি : মাননীয় প্রশাসক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ছবি : মাননীয় প্রশাসক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন

হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, মার্কেট, বিজ্ঞাপন ফি ও টেন্ডারে স্বচ্ছতার দাবি—রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান

 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি, কর নির্ধারণে অনিয়ম, ট্রেড লাইসেন্স, মার্কেট ও দোকান বরাদ্দ, বিজ্ঞাপন ফি আদায়, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সেবায় অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ মাঝেমধ্যে সামনে আসে।
এ অবস্থায় ডিএসসিসি প্রশাসনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঘোষণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ এবং নিয়মিত জবাবদিহিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।
রাজস্ব ফাঁকি—সিটি কর্পোরেশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
ডিএসসিসির নিজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, মার্কেট ও সম্পত্তি থেকে আয়, বিজ্ঞাপন ফি এবং বিভিন্ন ধরনের কর ও ফি থেকে।
কোনো খাতে প্রকৃত আয় গোপন করা, কম মূল্যায়ন করা, সরকারি ফি যথাযথভাবে আদায় না করা অথবা আদায়কৃত অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে করপোরেশন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করতে নিয়মিত অডিট, ডিজিটাল ডাটাবেজ, মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা জরুরি।
হোল্ডিং ট্যাক্সে স্বচ্ছতা প্রয়োজন
একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবহার, আয়তন ও শ্রেণি অনুযায়ী কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে দেখতে হবে—কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে কর কম নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না অথবা করদাতার কাছ থেকে নির্ধারিত অর্থের বাইরে কোনো অর্থ দাবি করা হয়েছে কি না।
প্রতিটি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ড এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ট্রেড লাইসেন্স: সেবার নামে হয়রানি বন্ধের দাবি
ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স একটি নিয়মিত নাগরিক সেবা। কিন্তু এই সেবা নিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, ফাইল আটকে রাখা কিংবা নির্ধারিত ফি’র বাইরে অর্থ দাবি করার অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
ডিএসসিসির প্রতিটি অঞ্চলে ট্রেড লাইসেন্স সংক্রান্ত কার্যক্রমে—
নির্ধারিত ফি, আবেদন প্রক্রিয়া, অনুমোদনের সময়সীমা ও অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
মার্কেট ও দোকান বরাদ্দে নজরদারি
ডিএসসিসির আওতাধীন বিভিন্ন মার্কেটের দোকান বরাদ্দ, ভাড়া, নবায়ন, হস্তান্তর ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো দোকান প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য কারও নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে কি না এবং সরকারি রাজস্ব যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত পরিদর্শন দরকার।
বিজ্ঞাপন খাতেও রাজস্ব সুরক্ষা জরুরি
সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন ছাড়া বিজ্ঞাপন স্থাপন, নির্ধারিত ফি’র কম অর্থ আদায় কিংবা বিজ্ঞাপনের প্রকৃত আয়তন গোপন করার মাধ্যমে রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ জন্য বিজ্ঞাপন খাতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করে প্রতিটি বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড ও বিজ্ঞাপনের অবস্থান, আয়তন, অনুমোদন এবং প্রদেয় ফি সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
টেন্ডারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি
উন্নয়নকাজ, পণ্য ও সেবা ক্রয় এবং বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ডিএসসিসি প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী, ঠিকাদার বা প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া গেলে নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত।
ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারে ‘জিরো টলারেন্স’ বাস্তবায়নের দাবি
দুর্নীতিবিরোধী ঘোষণা তখনই কার্যকর হবে যখন অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত অনুসন্ধান, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পদমর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাব—কোনোটিই যেন তদন্তের ক্ষেত্রে বিবেচ্য না হয়—এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন
কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। একইভাবে অভিযোগ উপেক্ষা করাও সমাধান নয়।
তাই ডিএসসিসিতে একটি কার্যকর অভিযোগ যাচাই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে—
অভিযোগ গ্রহণের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকবে;
অভিযোগের রেফারেন্স নম্বর দেওয়া হবে;
তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ থাকবে;
সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হবে;
প্রয়োজন হলে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন হবে;
অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হবে;
তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসকের ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলনই এখন দেখার বিষয়
দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসকের কঠোর অবস্থান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু নগরবাসীর প্রত্যাশা হলো—এই ঘোষণা যেন শুধু সভা, বক্তব্য বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করে অর্থ উদ্ধার, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা, নাগরিক সেবা সহজ করা এবং সরকারি সম্পদের সুরক্ষা—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপই প্রশাসনের সফলতার প্রকৃত মাপকাঠি।
শেষ কথা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব হলো নগরবাসীর অর্থ ও নগর উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তাই রাজস্ব ফাঁকি, ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সরকারি সম্পদের অপচয়—যে কোনো অভিযোগই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেই দিকেই নজর নগরবাসীর।
ডিএসসিসিকে সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাজস্ব বিভাগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

অগ্রণী ব্যাংকে অস্থায়ীদের স্থায়ীকরণের প্রলোভনে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

news image

বাঘ ও মানুষের সংঘাত ঠেকাতে সুন্দরবনে নাইলনের বেড়া

news image

জি+৯ ভবন ঘিরে যত প্রশ্ন—ইঞ্জিনিয়ার আসাদের ভবনে নকশার ব্যত্যয়ের অভিযোগ

news image

নকশায় বেজমেন্টসহ ১০ তলা, বাস্তব নির্মাণ কতটা অনুমোদন অনুযায়ী?

news image

বসুন্ধরা গ্রুপের জমি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সরকারি সংস্থার নজরদারি

news image

নরসিংদী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফুলকাম বাদশাহকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ ও তার মতামত

news image

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ

news image

রেলের ডিজির পিএস নাসির উদ্দীনকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়

news image

রাজস্ব ফাঁকি থেকে ঘুষ-দুর্নীতি: ডিএসসিসিতে প্রশাসকের ‘জিরো টলারেন্স’ কতটা কার্যকর?

news image

ভাওতাবাজির শীর্ষে মীর হাজিরবাগের আরিফুল ইসলাম—রাজউকে অভিযোগ, উঠছে নানা প্রশ্ন

news image

আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞান সাধনার অনন্য কেন্দ্র "চন্দ্রপাড়া পাক দরবার শরীফ"

news image

গোলাপবাগে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ

news image

রাজধানী ডেমরার ডেভেলপারদের নয়নমণি "রমজান মাস্টারের" রূপসী পল্লী টাওয়ার-১৫ কি রাজউকের সমস্ত নিয়ম মেনেই তৈরি হচ্ছে?

news image

হোটেল-রেস্তোরাঁর ধোঁয়ায় বায়ুদূষণের অভিযোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

news image

মীর হাজীরবাগে রাজউকের অনুমোদিত নকশার বাইরে ইমারত নির্মাণের অভিযোগ

news image

পার্বত্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তৎপর রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী

news image

নৈতিক স্খলনের অভিযোগে এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

news image

ভাইরাল ভিডিও বিতর্ক: প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে দাবি এমপি গাজী নজরুল ইসলামের

news image

বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার সেলিম প্রধান

news image

একযোগে ৩৪ বিচারককে বদলি ও ৪ জনের পদোন্নতি

news image

শাপলা চত্বর মামলা: একাত্তর টিভির লাইসেন্স ও নথি তলব

news image

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত