বুধবার ২৮ অক্টোবার ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
সম্পাদকীয়

তারেক রহমান সরকারের অগ্রগতির পথ: প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণ দেখতে চায় বাস্তব সাফল্য

প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। জনগণ সরকারের কাছে শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায়।

একটি সরকারের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হয় তার রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং সরকারি সেবার মান দিয়ে। তাই তারেক রহমান সরকারের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত কর্মসূচি, দক্ষ প্রশাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণই হোক প্রধান অগ্রাধিকার

দেশের সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য পণ্যের দাম মানুষের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহব্যবস্থা সচল, মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হবে।

তবে শুধু অভিযান পরিচালনা করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমানো, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্যসহায়তাও বাড়াতে হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি অসম্পূর্ণ

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে না পারলে জনসংখ্যার সম্ভাবনা অর্থনৈতিক চাপে রূপ নিতে পারে। তাই কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন ও সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসা নিবন্ধনের জটিলতা হ্রাস, বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা জরুরি

দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহার উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এসব অনিয়মের কারণে একদিকে জনগণের অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকারের উচিত সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত ই-টেন্ডার, প্রকল্পের ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ এবং সরকারি দপ্তরে অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।


আইনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে

জনগণ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে, ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির ভয় ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে এবং নাগরিকেরা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ন্যায়বিচার পাবে—এটাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

পুলিশ ও প্রশাসনকে পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত, অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে বিরোধী মত, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সরকারকে সংবেদনশীল থাকতে হবে।

ব্যাংক খাত ও বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো প্রয়োজন

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আর্থিক অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তবে ব্যাংক খাতের সংস্কার এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল ব্যবসায়ীরা অর্থায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির ধারাবাহিকতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি এবং দ্রুত সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত করা দরকার। তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকারে সংস্কার চাই

সরকারি হাসপাতালের সেবার মান, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মান, কারিগরি দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানমুখী প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।
ঢাকা ও অন্যান্য নগর এলাকায় যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ করে তুলছে। এসব সমস্যার সমাধানে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবহন সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সেবার মানও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময়সীমা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। কোন প্রতিশ্রুতি কত দিনে বাস্তবায়িত হবে, তার দায়িত্ব কার ওপর থাকবে এবং কীভাবে অগ্রগতি যাচাই করা হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট থাকতে হবে।
প্রতি মাস বা তিন মাস অন্তর গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করা যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো সূচকে অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে সরকারের সাফল্য ও দুর্বলতা দুটোই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা মানেই সরকারের বিরোধিতা নয়; বরং তথ্যভিত্তিক সমালোচনা প্রশাসনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।

জাতীয় ঐক্য ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য জরুরি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতি দমন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

উপসংহার

তারেক রহমান সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখার। তবে সেই অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃঢ়তা।

জনগণ দেখতে চায়—বাজারে স্বস্তি ফিরছে, তরুণেরা কাজ পাচ্ছে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কমছে, সরকারি দপ্তরে হয়রানি হ্রাস পাচ্ছে এবং ন্যায়বিচার সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি অর্জন করতে পারলেই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হওয়া উচিত—দল বা ব্যক্তি নয়, সবার আগে জনগণের স্বার্থ। প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফল; ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, জনসেবা; আর রাজনৈতিক বিভাজন নয়, জাতীয় অগ্রগতিই হোক তারেক রহমান সরকারের পথচলার প্রধান অঙ্গীকার।

আরও খবর

news image

তারেক রহমান সরকারের অগ্রগতির পথ: প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণ দেখতে চায় বাস্তব সাফল্য

news image

মোটরসাইকেলের সামনের নম্বর প্লেট: আধুনিক বিশ্বের চর্চা, নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

news image

বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা

news image

তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাসের চাপে জনগণের নাভিশ্বাস—জনস্বস্তি ফিরবে কবে?

news image

অটোরিকশার চাপ কমাতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই

news image

আজাদ খান: চিকিৎসা, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যে এক দীর্ঘ অভিযাত্রার নাম

news image

অপরাধ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যকর ক্ষমতার বিকল্প নেই

news image

জেমিনির এআই কনটেন্ট থেকে ওয়াটারমার্ক সরানোর সুযোগ দিচ্ছে গুগল

news image

যে কারণে সব সিম কার্ডের এক কোণা কাটা থাকে

news image

বিকাশ, রকেট ও নগদের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আরোপ কেন বেআইনি নয়: হাইকোর্ট

news image

অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য ৩৬৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে লিগ্যাল এইড