নিজস্ব প্রতিবেদক || ঢাকা নিউজ অনলাইন ২৪ ডেস্ক ১০ আগষ্ট ২০২৬ ০৯:২২ পি.এম
ছবি : মাতুয়াইল ডিপিডিসির লাইনম্যান ফয়েজুর রহমান ফয়েজ
১১ বছর সাসপেন্ড থাকার দাবি, এরপর বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ
দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ—তদন্তের দাবি।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড—ডিপিডিসির মাতুয়াইল কার্যালয়ের লাইনম্যান মোঃ ফয়েজুর রহমানকে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। দীর্ঘদিন চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত থাকার দাবি, পরবর্তীতে চাকরিতে পুনর্বহাল এবং বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ফয়েজুর রহমান কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথিত যোগসাজশ এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
১১ বছর সাসপেন্ড—তারপর সম্পদের পাহাড়?
প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ফয়েজুর রহমান দাবি করেছেন, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তিনি প্রায় ১১ বছর চাকরি থেকে সাসপেন্ড ছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তার চলাফেরা করা এবং পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু এখানেই সামনে আসে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দীর্ঘ সময় চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত থাকার পর বর্তমানে তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে যে বিপুল সম্পদের অভিযোগ উঠেছে, সেসব সম্পদের অর্থের উৎস কী?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে তার সার্ভিস রেকর্ড, বিভাগীয় মামলা, সাসপেনশন আদেশ, তদন্ত প্রতিবেদন, পুনর্বহালের আদেশ, আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন ভাবে জানা যায় বা শোনা যায়
ফয়েজুর রহমানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে।
প্রাপ্ত নথিতে ফয়েজুর রহমানের ইংরেজি নাম Md Fayzur Rahman, জন্মতারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৭৪, জন্মস্থান লক্ষ্মীপুর এবং পেশা সরকারি চাকরি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিকের তথ্যও নথিতে রয়েছে।
নথিতে তার পিতা মোঃ নুরুল ইসলাম, মাতা জাহানারা বেগম এবং স্ত্রী আফছানা আক্তার (সুমা)-এর নাম উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায় ফয়েজুর রহমান ক্রয় সূত্রে মালিক, হোল্ডিং নং - ১৫/১২ (২য় তলা), বায়তুল আকসা জামে মসজিদ রোড, পূর্ব শান্তিবাগ, ওয়ার্ড নং - ৬৫, ডেমরা, ঢাকা। তাছাড়া তার রয়েছে একাধিক ফ্লাটের শেয়ার, বোখারী টাওয়ার - ৪, আল - মদিনা টাওয়ার সহ বিভিন্ন স্থানে যৌথভাবে জমির শেয়ার বিদ্যমান।
মূলত তার এই টাকার খনিই হল মাতুয়াইল ডিপিডিসি। এটা কি সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান, নাকি অন্যায় ও বিভিন্ন কৌশলে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি করে, জনগণকে বাধ্য করে অর্থ উপার্জনের কেন্দ্রবিন্দু তা বোধগম্য নয়। রাজধানীর ডেমরার পূর্ব শান্তিবাগ এলাকায় একটি ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন স্থানে তার ফ্ল্যাট ও জমির মালিকানা বা শেয়ার থাকার অভিযোগও রয়েছে।
পাশাপাশি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা মূল্যের একটি মাইক্রোবাস থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, বাজারমূল্য এবং ক্রয়ের অর্থের উৎস এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
‘সবাইকে ম্যানেজ করতে হয়’—বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
ফয়েজুর রহমানের সাক্ষাৎকারে দেওয়া কিছু বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে।
তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল—“সবাইকে ম্যানেজ করতে হয়”। একইসঙ্গে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না—এমন বক্তব্য দেওয়ার কথাও প্রতিবেদকের কাছে এসেছে।
এই বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী এবং ‘ম্যানেজ’ বলতে তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তা প্রভাব খাটিয়ে নিষ্পত্তি করার সুযোগ থাকে, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য অবশ্যই তদন্তের বিষয়।
ডিপিডিসির সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ?
ফয়েজুর রহমানের বিরুদ্ধে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ হলো—মাতুয়াইল ডিপিডিসিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন বিদ্যুৎ সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে সুবিধা আদায় করতেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের ঘটনাও ঘটেছে। তার এই সবের মূল হাতিয়ার ছিল সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন। সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর নামে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ঘুষ-অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র প্রস্ফুটিত হয়।
স্ত্রীর নামে ‘নেটিভ পাওয়ার লিমিটেড’
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ফয়েজুর রহমানের স্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে ‘নেটিভ পাওয়ার লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে নামে বেনামে চুক্তিবদ্ধ হয়ে লিফট, সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কী এবং ডিপিডিসির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সরাসরি বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে কি না।
যদি ডিপিডিসির সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব ও পারিবারিক ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
মাতুয়াইল ডিপিডিসি—সেবা প্রতিষ্ঠান নাকি হয়রানির অভিযোগের কেন্দ্র?
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, মাতুয়াইল ডিপিডিসির বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে গ্রাহকদের একাংশকে নানা ধরনের হয়রানি ও অনিয়মের মুখোমুখি হতে হয়।
তাদের অভিযোগ, এসব পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি কথিত চক্র অবৈধ সুবিধা আদায় করে থাকে এবং ফয়েজুর রহমানও সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
অবশ্য এ অভিযোগও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অফিসের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
‘লাইনম্যান যখন কোটিপতি, তাহলে প্রকৌশলীদের অবস্থা কী?’
ফয়েজুর রহমানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এখন আরও বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—
একজন লাইনম্যানের বৈধ আয় ও চাকরির সঙ্গে যদি কথিত বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে সেই সম্পদ কীভাবে তৈরি হলো?
আরও প্রশ্ন—তার দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা এসব বিষয়ে অবগত ছিলেন কি না এবং থাকলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা
ফয়েজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে **দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)**সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অভিযোগকারীরা।
তারা তার—
আয়কর রিটার্ন;
সম্পদ বিবরণী;
জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল;
ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন;
যানবাহনের মালিকানা;
পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ;
‘নেটিভ পাওয়ার লিমিটেড’-এর মালিকানা;
ডিপিডিসির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সম্পর্ক;
ডিপিডিসির টেন্ডার ও সরবরাহের নথি;
১১ বছর সাসপেন্ড থাকার সরকারি রেকর্ড
যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা, লাইনম্যান ফয়জুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
ফয়েজুর রহমানের বক্তব্য
ফয়েজুর রহমানের সঙ্গে প্রতিবেদকের সাক্ষাৎকালে তিনি তার দীর্ঘদিন সাসপেন্ড থাকার কথা তুলে ধরেছেন এবং সেই সময়ের নানা প্রতিকূলতার কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে ‘ম্যানেজ’ করার প্রসঙ্গও এসেছে।
তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সম্পদ, দুর্নীতি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত লিখিত বক্তব্য বা প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেলে ঢাকা নিউজ অনলাইন ২৪ তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করবে।
পোস্তগোলা বিদ্যুৎ অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, যা দেখার কেউ নাই
কমলাপুর রেলস্টেশনে মাস্টাররোল কর্মীদের বেতন থেকে টাকা কাটার অভিযোগ
অভয় দাস লেন সরু গলির ভিতরে বহুতল ভবন: জনদুর্ভোগের 'মরণ ফাঁদ'
যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে রাজউকের অনুমোদিত নকশা ছাড়াই ভবন নির্মাণের অভিযোগ, কাজ বন্ধের নির্দেশ
ধলপুরে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই জি+৯ ভবন নির্মাণের অভিযোগ
মাতুয়াইল ডিপিডিসির লাইনম্যান যখন কোটিপতি, তাহলে প্রকৌশলীদের অবস্থা কী?
রাজউকের নকশা পরিবর্তনের অভিযোগ, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার—ঝুঁকিতে তারেক টাওয়ার
যাত্রাবাড়ীতে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের অভিযোগ, মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ
ঢাকা দক্ষিণ ৪৯ নং ওয়ার্ড থেকে মোবারক হোসেনের বদলি
তদবির বাণিজ্যে ও মুদ্রা পাচারের মাধ্যমে অর্জিত অঢেল সম্পত্তির মালিক কে এই কোহিনূর চোকদার?
শরীরে আয়রনের অভাব? যেসব খেতে পারেন
শিশু নির্যাতন বন্ধে চাই মানুষের মধ্যে সুকুমারবৃত্তির বিকাশ