মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবার ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

অনলাইন ডেস্ক ১৯ সেপ্টেম্বার ২০২৬ ০৭:৪৫ পি.এম

ছবি : সংগৃহীত ছবি : সংগৃহীত

গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন তিনি রিয়াদে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হচ্ছিল।

সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করতে সেখানে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের এই সর্বময় প্রভাবশালী সেনাপ্রধান।

জেনারেল মুনিরের কাছে এটি ছিল বড় ধরনের এক কূটনৈতিক বিজয়। এই চুক্তির ফলে তীব্র অর্থসংকটে ভোগা পাকিস্তান পাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জীবনরক্ষাকারী বিনিয়োগ ও ঋণ। তার বিনিময়ে সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে ইসলামাবাদ। আর সৌদি ভূখণ্ডে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো হামলা হলে দেশটির সুরক্ষায় মাঠে নামবে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী।

বিশ্লেষকদের মতে, তখন পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ ছিল পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক খুব দ্রুত স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে এবং মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি কম।

তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই হিসাব পুরোটায় উলটে যায়। ফেব্রুয়ারি নাগাদ পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করে এবং জবাবে ইরানও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

এর প্রভাবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের থমকে যাওয়া পুরোনো সংঘাত নতুন করে দানা বাঁধতে সময় নেয়নি। তাদের মধ্যবর্তী ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। চলতি মাসের শুরুর দিকে হুথিরা ইয়েমেনে অভূতপূর্ব ভূখণ্ডগত সাফল্য অর্জন করে এবং সৌদি আরবে ড্রোন ও হামলা চালায়। জবাবে সৌদি আরবও ইয়েমেনে জোরালো বিমান হামলা শুরু করেছে। অনেকের মতে, অঞ্চলটিতে আবারো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই নতুন পরিস্থিতিতে চরম চাপের মুখে পড়েছেন পাকিস্তান ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। গত আগস্টে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সেই সামরিক চুক্তিতে তুরস্ককে যুক্ত করা হয় এবং এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা মানে বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা বলে গণ্য হবে।

লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমার মনে হয় না আসিম মুনির আঞ্চলিক ঝুঁকির মাত্রা সঠিক হিসাব করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানের সৈন্যদের এত দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে নামাতে হতে পারে, তা তিনি হয়তো ভাবেননি।’

সৌদি আরবের কাছে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম থাকলেও যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত কৌশলী হুথি বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের হুমকি সামলে অভ্যস্ত পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এই রণক্ষেত্রে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিদের দমনে সৌদি আরব যদি ‘মক্কা চুক্তি’ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পাকিস্তানের সামনে সেনা পাঠানো ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না—এমনকি প্রশিক্ষণের কাজে সৌদি আরবে অবস্থানরত হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনাকেও যুদ্ধের ময়দানে নামাতে হতে পারে। কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান এখন সৌদি আরবের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সম্প্রতি দেশটি পাকিস্তানকে জরুরি ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারের তহবিল ও বিনিয়োগ দিয়েছে।

সম্প্রতি পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তায় তারা ‘অনড়’ ও ‘নিঃশর্ত’ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশটির প্রতিরক্ষায় পাকিস্তান ‘যেকোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত।

বাহ্যিক মনোভাব কড়া হলেও পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের কর্তাব্যক্তিরা মধ্যপ্রাচ্যের এই অশেষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন। দেশটির অর্থনীতি এমনিতেই ধসে পড়েছে; একই সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে কার্যত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং সীমান্ত এলাকায় তীব্র জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি সামাল দিতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অনেকের মতে, মক্কা চুক্তি কার্যকর করা মানে ইরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলি হামলার আগে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল। সেই সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইরানের ওপর পাকিস্তান যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছে, তেমনি ইসলামাবাদের ওপরও তেহরান বিশ্বাস হারিয়েছে।

বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকার মতে, হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের যোগদান বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইরানের পর পাকিস্তানেই সবচেয়ে বেশি শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস। ইয়েমেনের হুথিদের ওপর হামলায় পাকিস্তান অংশ নিলে দেশের ভেতরেই বড় ধরনের সুন্নি-শিয়া উত্তেজনার পারদ চড়তে পারে।

তাছাড়া, আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে ইরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যুদ্ধে জড়ালে আফগান সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি তালেবানদের সহিংসতা আরও প্রাণঘাতী রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানসংলগ্ন অস্থিতিশীল সীমান্ত অঞ্চল বেলুচিস্তানেও দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে পারে।

পাকিস্তান সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাস বলেন, মক্কা চুক্তিতে আসলে কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কয়েক ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানে না। দেশটির অঘোষিত শাসক সামরিক বাহিনী হওয়ায় সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্টেও তোলা হয়নি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘পাকিস্তান যদি এই যুদ্ধে ঝাঁপ দেয়, তবে তা দেশের জন্য মহাবিপর্যয় নিয়ে আসবে। আমরা ইতোমধ্যে দুটি রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সামলাচ্ছি; অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। এই সংঘাতের এক পক্ষে যোগ দিলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি হবে।’

আরও খবর

news image

রিয়াদের দিকে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি সৌদি জোটের

news image

ইন্দোনেশিয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়া মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

news image

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল ও মদিনায় ৫টি ড্রোন ভূপাতিতের দাবি জোটের

news image

বাণিজ্য কূটনীতির লক্ষ্য নিয়ে ভারতে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও

news image

চীনে এপেক সম্মেলনে পুতিন, শি ও ট্রাম্পের বৈঠক হতে পারে: ক্রেমলিন

news image

প্যারিসে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতায় রেকর্ড ৮৫৫ জন গ্রেপ্তার

news image

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নির্ধারণে একমত হতে পারেনি জাতিসংঘ জলবায়ু প্যানেল

news image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৪

news image

সৌদি আরবের তেল স্থাপনা আরামকোতে হামলার দাবি হুতিদের, আরও হামলার হুঁশিয়ারি

news image

ভোটার তালিকায় ১৩ কোটি নাম বাদ, বিতর্কে মোদি সরকার

news image

রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের হামলা, ট্রাম্পের কড়া বার্তা

news image

বুলগেরিয়ার উপকূলে ২টি জাহাজে ড্রোন হামলা, নিখোঁজ কয়েকজন নাবিক

news image

মালয়েশিয়া থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফিরেছেন প্রায় দেড় হাজার অভিবাসী

news image

নতুন হামলার হুমকি ইরানের, হরমুজ নিয়ে মার্কিন জবাবের অপেক্ষা

news image

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজে অ্যানথ্রপিকের প্রধান আমোদেই

news image

‘শোচনীয়ভাবে হেরে যাচ্ছে ইরান, এখন চুক্তি করতে চায়’

news image

যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে : ইরানের প্রেসিডেন্ট

news image

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার আহ্বান ইইউ পররাষ্ট্রনীতি প্রধানের

news image

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

news image

হরমুজ প্রণালীতে ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতে ট্যাংকারে আগুন

news image

গোপনে ‘ক্লড’ এআই ব্যবহার করে বড় অস্ত্র বানাচ্ছে হুথিরা

news image

ইয়েমেনের ৩২ জায়গায় বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি, দাবি হুথিদের

news image

এক সপ্তাহে ১২ হাজারেরও বেশি প্রবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি

news image

ইরানে জ্বালানি ট্যাংকার বিস্ফোরণে নিহত ১০

news image

৫০০ বছরের পুরোনো মানচিত্র বদল, বিশ্বকে নতুনভাবে দেখাবে জাতিসংঘ

news image

শত্রুরা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে পারবে না: ইরান

news image

মার্কিন হামলার পর ইরানের পালটা আঘাত, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

news image

তেলাপোকার মৃত্যুতে একাকিত্বে ভুগছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী

news image

বিশ্বজুড়ে মার্কিন ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত

news image

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত, সব আরোহী নিহত