বুধবার ২৮ অক্টোবার ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা

ছবি ছবি

বাংলাদেশের মানুষ সরকারের কাছে শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়—চায় নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার, সুশাসন, কর্মসংস্থান এবং স্বস্তির অর্থনীতি। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুবই বাস্তব; তারা চায় রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন নাগরিকের সেবায় কাজ করে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেন দল, পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পাওয়া যায়।

১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা। বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

২. কর্মসংস্থান ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ

দেশের তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং দেশ-বিদেশে বৈধ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ—উভয়েই বাংলাদেশের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে তরুণদের সুযোগ বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।

৩. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা

মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করে যেখানে ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া যাবে। সরকারি ক্রয়, ভূমি, রাজস্ব, নির্মাণ অনুমোদন, আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৪. আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার

আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, সাধারণ মানুষের জন্য সহজে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

৫. পুলিশ ও প্রশাসনকে জনবান্ধব করা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণকে সেবা দেওয়া। থানায় সাধারণ মানুষ যেন হয়রানি ছাড়া অভিযোগ করতে পারে এবং সরকারি দপ্তরে যেন কাজের জন্য অযথা ঘুরতে না হয়—এ প্রত্যাশা ব্যাপক।

৬. স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বাস্তব উন্নয়ন

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা মানুষের মৌলিক প্রত্যাশার অংশ। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

৭. ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম ও আমানতকারীদের আস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। আইএমএফও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও সুশাসন জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।

৮. ব্যবসা-বাণিজ্যে হয়রানি কমানো

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, দ্রুত লাইসেন্স, ডিজিটাল সেবা এবং হয়রানিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হলে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।

৯. সরকারি সেবায় ডিজিটাল স্বচ্ছতা

নাগরিকের আবেদন, অভিযোগ, ভূমি, কর, লাইসেন্স, সরকারি ক্রয় ও বিভিন্ন সেবার তথ্য যত বেশি ডিজিটাল ও উন্মুক্ত হবে, তত বেশি জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে।

১০. নিরাপদ সড়ক ও নাগরিক জীবন

সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন—বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের মানুষের প্রতিদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

১১. কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার

কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান এবং শ্রমিক যেন ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পান—এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১২. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি

সরকারের কাছে মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা—কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে। সরকারি অর্থ ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, জমি অধিগ্রহণ, সরকারি ক্রয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জনগণের মূল প্রত্যাশা একটাই—কথার চেয়ে কাজ

বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যাবে, অন্যায় হলে প্রতিকার পাওয়া যাবে, যোগ্যতা থাকলে সুযোগ পাওয়া যাবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বচ্ছতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জনবান্ধব প্রশাসন—এসব বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও উঠে এসেছে।

জনগণ সরকারের কাছে অলৌকিক কিছু চায় না। তারা চায়—ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ জীবন, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র।

আরও খবর

news image

তারেক রহমান সরকারের অগ্রগতির পথ: প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণ দেখতে চায় বাস্তব সাফল্য

news image

মোটরসাইকেলের সামনের নম্বর প্লেট: আধুনিক বিশ্বের চর্চা, নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

news image

বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা

news image

তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাসের চাপে জনগণের নাভিশ্বাস—জনস্বস্তি ফিরবে কবে?

news image

অটোরিকশার চাপ কমাতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই

news image

আজাদ খান: চিকিৎসা, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যে এক দীর্ঘ অভিযাত্রার নাম

news image

অপরাধ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যকর ক্ষমতার বিকল্প নেই

news image

জেমিনির এআই কনটেন্ট থেকে ওয়াটারমার্ক সরানোর সুযোগ দিচ্ছে গুগল

news image

যে কারণে সব সিম কার্ডের এক কোণা কাটা থাকে

news image

বিকাশ, রকেট ও নগদের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আরোপ কেন বেআইনি নয়: হাইকোর্ট

news image

অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য ৩৬৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে লিগ্যাল এইড